বুধবার ১৭ জুন ২০২৬
Online Edition

জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে শেষ মুহূর্তেও অনিশ্চয়তা কাটেনি 

মুহাম্মদ নূরে আলম: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে এখনো আসেনি চূড়ান্ত ঘোষণা। অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে শেষ মুহূর্তে দরকষাকষি করেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এছাড়াও এবারের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনকে ‘কপ অব দ্য ফিন্যান্স’ বা অর্থায়নের কপ বলা হলেও সেটি কেবল কাগজে-কলমেই ঠেকেছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলো বার্ষিক à§§ দশমিক à§© ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জলবায়ু ক্ষতিপূরণের যে দাবি জানিয়েছিল, সম্মেলনের ১১তম দিনেও সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। এমনকি বিগত বছরগুলোর ক্ষতিপূরণের বিষয়ে মেলেনি কোনো আশ্বাস। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে চলমান জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন কপ-২৯ এর নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে গতকাল শুক্রবার। à§§à§§ নবেম্বর শুরু হওয়া এ সম্মেলনের সফলতা কতটুকু আসবে তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। তবে আশা ছাড়েনি বাংলাদেশ। এই অবস্থায় জলবায়ু সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার আজারবাইজানের বাকুতে কপ২৯-এর চূড়ান্ত ফলাফলের বিষয়ে এলডিসি মন্ত্রী এবং ইইউ মন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ আহ্বান জানানো হয় বলে জানিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এদিকে বেশ কয়েকটি সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রাপ্য জলবায়ু ফান্ডের অর্থ ছাড় দেয়া নিয়ে বিশ্বমোড়লদের চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের (কপ২৯) শেষ বেলায় এসেও বিক্ষোভ করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও চেয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। এই সম্মেলন ঘিরে যে ‘নিউ কালেক্টিভ কোয়ান্টিফাইড গোল’ নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে সম্মেলেনের দ্বিতীয় সপ্তাহেও ফলপ্রসূ কিছু হয়নি বলে জানিয়েছেন বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। তিনি বলেন, প্যারিস চুক্তিতে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এনসিকিউজিতে সেটা ১০ গুণ চাহিদা বাড়িয়ে à§§ দশমিক à§© ট্রিলিয়ন ডলার করা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবারের কপে প্যারিস চুক্তিরও এক-তৃতীয়াংশ, মাত্র ৩০০ মিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানে মাত্র ৬১ মিলিয়ন ডলার কমিটমেন্ট এসেছে। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন ক্ষতিপূরণ আদায়ের এই পথকে বেশ জটিল ও কঠিন মনে করছেন ক্যাপসের চেয়ারম্যান। এই জলবায়ু বিশেষজ্ঞের মতে, অর্থছাড় বা ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বিগত বছরগুলোয় উন্নত বিশ্ব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করেনি। ফলে কপ২৯-এর শেষ সময়ে অর্থছাড়ের বিষয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

যে à§§ দশমিক à§© ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি আশা করা হচ্ছে, প্রাথমিকভাবে ধনী দেশগুলো তা সরবরাহ করবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যও আর্থিক ভূমিকা রাখার চাপ বাড়ছে। এই তহবিল প্রাথমিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বেশি। শেষ মুহূর্তে এসেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, বিশ্বনেতারা বিদ্যমান বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না এবং জলবায়ু অর্থায়নে একটি অর্থবহ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন কি না। লস অ্যান্ড ডেমেজ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ ডেলিগেশন টিমের সদস্য মো. হাফিজ খান বলেন, ‘অ্যাডাপটেশন, মিটিগেশন, লস অ্যান্ড ড্যামেজ খাতে বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে উন্নত রাষ্ট্রের দেওয়া উচিত। বার্ষিক à§§ দশমিক à§© ট্রিলিয়ন ক্ষতিপূরণের একটি গোল সেট করা এবারের কপের মূল লক্ষ্য।’

বৈঠকে অবশিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানে উভয়পক্ষের সহযোগিতার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক চুক্তি অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এতে উপস্থিত বাংলাদেশ প্রতিনিধি বলেন, অনেক সমস্যা এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধানে উভয়পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে কপ২৯-এ একটি অর্থবহ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চুক্তি নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তিনি। এসময় এলডিসি মন্ত্রীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে তাদের মূল অবস্থান তুলে ধরেন। তখন ইইউ মন্ত্রীরা এলডিসি দেশগুলোর উদ্বেগের বিষয়গুলো স্বীকার করেন এবং জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। 

 

প্লানেট নিয়ে কাজ করা পরিবেশবাদী কোরিয়ান সংগঠন কে-গ্রিন ফাউন্ডেশন, আফ্রিকার কয়েকটি দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও গ্রিন ওয়ার্ল্ড নিয়ে কাজ করা আজারবাইজানের পরিবেশবাদী সংগঠন ইরাসমাস স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক রয়েছে। আজারবাইজানের সংগঠনটির দাবি, গ্রিন ওয়ার্ল্ড গড়তে অবশ্যই ফান্ড ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে এই সুন্দর পৃথিবী অবশ্যই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে।

আর ২০০২ সাল থেকে প্লানেট নিয়ে কাজ করা কোরিয়ান সংগঠনটির দাবি, বাকু সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য দ্রুত ফান্ড ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ফান্ড ছাড়ে বড় বাধা হলো যুক্তরাষ্ট্র। অথচ বড় বড় দেশগুলো বাতাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ছে। বিক্ষোভে কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়া বন্ধেরও দাবিও জানান সংগঠনটি।  কে-ফাউন্ডেশনের দাবি, জলবায়ুর অর্থ আমাদের ভবিষ্যৎ চলার পথ। সুতরাং ফান্ডের অর্থ সবাইকে বিলিয়ে দাও। অন্যদিকে, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের তিন-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী। ফলে আশা ছিল এ সম্মেলন থেকে অর্থায়নের ইতিবাচক বার্তা আসবে। কিন্তু ধরিত্রী রক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পদ্ধতি নিয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের টানাটানির অবসান কিভাবে ঘটবে, এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

এদিকে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা কম থাকায় আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশে হওয়া ক্ষতির পূরণে পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া যায় না, তাই অনুদান সহায়তা দরকার। গতকাল বুধবার বাকুতে কপ সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানান তিনি। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করারও আহ্বান জানান। উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নিউ কালেক্টিভ কোয়ান্টিফায়েড গোলের (এনসিকিউজি) আওতায় পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন জলবায়ু অর্থায়নের ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

উপদেষ্টা à§§ দশমিক à§© ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতি, অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন এবং স্বল্প সুদের ঋণের প্রস্তাব করেন। সরকারি অর্থায়নকে প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, অন্তত ২০ শতাংশ অর্থায়ন ইউএনএফসিসির (গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড) মাধ্যমে হওয়া উচিত এবং জলবায়ু অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান কপ২৯ সম্মেলনে জানান, ২০২৩ সালের অ্যাডাপটেশন ফান্ড গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর à§® দশমিক à§« বিলিয়ন ডলার অভিযোজন প্রয়োজন। তবে দেশীয় উৎস থেকে মাত্র à§© বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ হচ্ছে, ফলে à§« দশমিক à§« বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। ‘ক্ষয়-ক্ষতিপূরণ তহবিল এবং এনসিকিউজির অগ্রগতির ধীরগতি এবং প্রধান দূষণকারী দেশগুলোর উদ্যোগের অভাবে জলবায়ু অর্থায়ন পিছিয়ে রয়েছে,’ বলেন তিনি। এছাড়া তিনি ওয়ারশ আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার পর্যালোচনার স্থবিরতা এবং প্রশমন কর্মসূচির অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি উন্নত দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ